কিভাবে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র কৃত্রিম উপগ্রহ (Nano-satellite) পাইল ……

[For easier reading: PDF or EPUB]

কিভাবে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র কৃত্রিম উপগ্রহ (Nano-satellite) পাইল ……

By Dr. Arifur Rahman Khan

পর্ব -১

বল্গাহীন কল্পনা মনুষ্যকে তাঁহার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র থেকে শুধু আলাদাই করেনি, তাহাঁকে উত্তর পুরুষের কাছে ঋণীও করিয়াছে | তবে কঠিন বাস্তবতা এই যে, কল্পনার দস্তরখানায় আবৃত মানুষটি জীবতদশায় নিজ অবদান অবলোকন করিতে ক্ষীণমাত্রই পারঙ্গম হইয়াছে | তাই বলিয়াকি মুক্তচিন্তা রোহিতো হইয়াছে !

সভ্যতার সূচনা কাল হইতেই বহু মনীষী তাঁহাদের সময়কালকে অবজ্ঞা করিয়াই বিজ্ঞান চর্চা করিয়াছিলেন | সেই হেতু কেউ কেউ নিজের জীবনকে পর্যন্ত বিসর্জন দিয়াছিলেন | (উদাহরণঃ Giordano Bruno, তাঁর জ্ঞানই পরে Copernican model হিসাবে পরিচিতি পাইয়াছিল। সূত্রঃ Wikipedia ।) জ্ঞানের চর্চা, আত্মবিশ্বাস, দূরদর্শিতার সমাহারের কারণে জ্ঞানের এবং বিজ্ঞানের মানচিত্রের পরিসীমা প্রসারিত করিতে পারিয়াছিল বলিয়াই তাঁহারা আজো নমস্য, মহাকাশ বিদ্যায় আধুনিক হইতে আধুনিকতম হইতে পারিয়াছে| শুরুমাত্র সময়কালে ঊনারা ব্যাবহারিক প্রয়োগের চিন্তা মাথায় রাখিয়াছিল কিনা, বলিতে অপারগ, তথাপি আধুনিক মহাকাশ বিজ্ঞানের ভিত্তি তৈরিতে কোথায় নেই তাহাদের সোনালী পদচারনা ? জলবায়ু, যোগাযোগ, ভূপৃষ্ঠ পর্যবেক্ষণ ও পরিবর্তন অধ্যায়ন, কৃষি ব্যাবস্থাপনা ও উৎকর্ষ সাধন, নাবিকবিদ্যা, মহাকাশ অনুধাবন, এমনকি শত্রু নিধনেও এই বিদ্যার অহরহ ব্যবহার | অত্যাধুনিক মানবের রঙ্গমঞ্চে দাঁড়াইয়া একবার ভাবুনতো যে হতভাগাটি স্বীয় মস্তক বিসর্জন দিয়াও গ্রহ-নক্ষত্রর গতিবিদ্যাকে পরমসত্যি ভাবিয়াছিল, উনি কি পাইয়াছিলেন ? পাইয়াছে তাঁহার উত্তর পুরুষেরা, উত্তর নারীরা | জাতি তাঁহার আবিষ্কার লইয়া মুহুর্মূহু গোলবন্ধনী উঁচু করিতেছে, আর নব্য মানব শিশুরা তাঁহাদের আবিষ্কার পাঠ-পর অনুরনিত হইতেছে |

মহাকাশ লইয়া গবেষণা করিতে হইলে অথবা মানব কল্যানে ইহা প্রয়োগ করিতে হইলে কি করিতে হইবে? মগজ খেলাইতে হইবে, যন্ত্রপাতিনিয়া খেলিতে হইবে, যাহারা এই বিষয়ে পণ্ডিত তাহাদের আবিষ্কার লইয়া ভাবিতে হইবে, কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে পাঠাইয়া তার সাথে কথা বলিতে হইবে | কিভাবে ? মানবের মেধাকে যন্ত্রের সমতলে নামাইতে হইবে, বর্তমানে ০ (অচল) এবং ১ (সচল) ব্যবহার করিয়া সংকেত পাঠাইতে মাস্টারমশাইরা তো বটেই ছাত্ররাও যথেষ্ট পারঙ্গম হইয়াছে | ইহা ব্যাতিতও সুতাবিহীন সংকেত পাঠাইতে তরঙ্গবিদরা বহু পূর্বেই সফলতা দেখাইয়াছেন| এখন শুধু প্রয়োজন স্বপ্ন বুনন, দেখা এবং দেখানো | একদল স্বপ্নায়িত শিক্ষার্থীকে সুযোগ করিয়া দেওয়া |

বিশ্বের দৌলতদার রাজা- প্রজারা মহাকাশ এবং কৃত্রিম উপগ্রহ লইয়া তত্ত্বানুসন্ধান করিয়া প্রাপ্তিসমূহ সারাবিশ্বে যখন ছড়াইয়া দিয়েছে, তখন বাংলার জনগণ স্বাধিকার আদায়ে ঘর্মদেহ | অতঃপর নিজ ভূমি ও অক্ষরবর্ণ হইলো বটে, জ্ঞান আর বিজ্ঞানে পারিয়া উঠিল না| তাহার চাইতেও মনঃপীড়ার বিষয় হইলো কেহ চিন্তা অথবা চেষ্টাও করিল না | যাহারাও বা করিল, মুখ থুবড়াইয়া পড়িল, অথবা নবীনদের মধ্যে আলো বিতরণ করিতে লাগিল। ( উদাহরণ, F. R. Sorkar, নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করিয়া শিশুদের মাহাকাশের আলো দেখাইতেছে )। তাঁহাদের মধ্যে অনেকেই কেতাদুরস্ত অদূরদর্শী শিক্ষিত সমাজ কতৃক প্রতারিত হইয়া কেবলা পশ্চিম বা পূর্ব মুখী করিল | কেহ কেহ এই ভাবিয়া শান্তনা পাইলো যে সময় সুযোগ হইলে মাতৃভূমিতে ফিরিবে, নতুবা ভিনদেশে থাকিয়াই দেশের জন্য ভূমিকা রাখিবে |

এই মানসিক ডামাডোলের মধ্যে একটি সংবাদ আমাকে বড়োই আলোড়িত করিল | United Nations Office for Outer Space Affairs ভাবিয়া মনোস্হির করিল যে উদীয়মান এশিয়াবাসীকে শিক্ষা ও প্রযুক্তি দিয়া মহাকাশের দ্বার খুলিতে অনুপ্রাণিত করিবে এবং কৃত্রিম ক্ষুদ্রাকৃতি উপগ্রহ বানানো শিখাইবে | ঘাঁটি হিসাবে জাপানকে বাছিয়া লইলো যেখান কিয়োসু প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এই শিক্ষা ও প্রযুক্তি নবীন শিক্ষার্থীদের শিখাইবে এবং বুঝাইবে | প্রস্তাবনা ২০০৯ সালের, প্রয়োগ হইতে যাচ্ছে ২০১৩ সালে |

অনুধাবন করিতে বেগ পেতে হইলো না যে, এই রথের যাত্রী না হইলে আবারও আলোক-তন্তু-যোগাযোগ-প্রযুক্তি (Optical Fiber Communication Technology) যেই ভাবে আমাদের মুঠো গলিয়া বাহির হইয়া গিয়েছিলো, প্রথম দশাতে, এবারও তাহাই হইবে | বিদেশের খাইয়া দেশের নবীন মেধাকে তীক্ষ্ণ করিতে মন আনচান করিতে লাগিল ।

তড়িৎ-ডাক এ বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ করিতে শুরু করিলুম, কেহ বিশ্বাস তো দূরের কথা উত্তর-দক্ষিণ কিছুই বলিল না | অনূজ খলিল (Dr. Khalilur Rahman) কে বুঝাইলাম, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারি করে | উনার আগ্রহ মনে আশার সঞ্চয় করিল | প্রো-উপাচার্য আইনুন নিশাত স্যারের উৎসাহে বাংলাদেশে উড়িলুম ২০১৩ সালে | সে এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি ।

চলবে ………

[As seen at: https://www.facebook.com/arifur.khan.7/posts/10155479260157280

Published on: 14th May, 2017

Retrieved on: 5th June, 2018]

 

পর্ব -২

ঘটনাকাল ২০১৩, বাংলাদেশে আসিলুম, অনুজ খলিলকে পুরো পরিকল্পনা বুঝাইলুম, দেশ কি পাইবে, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় কি পাইবে, কাদের নাম ইতিহাসে লেখা থাকিবে, কিভাবে ডঃ আইনুন নিশাত স্যারকে বলিব, উনি কি প্রতিক্রিয়া দেখাইবেন, ইত্যাদি, ইত্যাদি। ইহার পটভূমিতে আরও একজন কে পাইলুম। মৌসুমি জহুর। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এ MNS বিভাগে শিক্ষকতা করিতেছিলেন এবং জাপানের Kitakyushu শহরে আবস্থান পূর্বক MS করিতেছিলেন । উনি পরিচয় করাইয়া দিলেন জিয়াউদ্দিন স্যার এর সাথে, MNS এর প্রধান। সৌভাগ্য ক্রমে উনি বিশাল হৃদয়ের মানুষ এবং SPARRSO (বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা এবং দুর আনুধাবন প্রতিষ্ঠান) এর সাবেক প্রধান। কথা হইল । মহাকাশ গবেষণার দ্বার খুলিতে উনি কি কি করিয়াছেন এবং আমাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কিভাবে কাহার কাহার সাথে আমাকে দেখা করিতে হইবে, ইত্যাদি, ইত্যাদি । প্রাথমিক ভাবে আমাদের পরিকল্পনা ছিল কিভাবে একটি ছাত্র-শিক্ষক বিনিময় চুক্তি করা যায়। কিন্তু চাইলেই কি হইবে, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখাইতে হইবে যে Kyushu Institute of Technology (Kyutech) এর সেই যোগ্যতা আছে, আমাকে তা দেখাইতে হইল। (link: http://www.thedailystar.net/…/seminar-on-satellite-research…) খালিল কে আমন্ত্রণ জানানো হইল সচক্ষে আমাদের সক্ষমতা দেখানোর জন্য, নবীন এক শিক্ষকের সাথে কথা হইল, যাহাকে Kyutech জাপান সরকারের বৃত্তি দিতে প্রস্তুত, তাহাঁকেও তৈল মর্দন করা হইল, যাহাতে তিনি এই বৃত্তি গ্রহণ করেন। ডঃ আইনুন নিশাত স্যারের সাথে কথা হইল, উনার দূরদর্শিতা দেখে মুগ্ধ হইলুম, আমি আর খালিল আশার আলো দেখিলুম।

এক হাড়িতে সব ডিম রাখা আনুচিত ভাবিয়া Independent University Bangladesh, (IUB) তে যোগাযোগ করিবার চেষ্টা করিলুম, যেখানে আমি একসময় মাস্টারি করিতুম। কিন্তু কাজ হইল না, একজন ভাবিলেন আমি বোধহয় চাকুরী চাইতে গিয়াছি। বুঝিলুম দূরদর্শিতার বরই অভাব।

Khalilur Rhaman কে বুঝিয়ে, নবীন শিক্ষকের মাথায় আরও কিছু ঘি ঢালিয়া ফিরিয়া আসিলুম। কিছুদিন পরে খালিল আসিল, দেখিল, বুঝিল, মোহিত হইল। বলিয়া রাখা বাঞ্ছনীয় যে খলিল, Kyutech এর PhD। সেই সুযোগে সে Kitakyushu এবং Fukuoka মাতাইয়া গেল।

ইতোমধ্যে, আমাদের গবেষণাগার জাপান সরকারের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছে। ফলশ্রুতিতে ছয়- ছয়টি সরকারি বৃত্তি দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ইহা সম্ভব হইয়াছে UNOOSA (http://www.unoosa.org/) এর সাথে Kyutech এর চুক্তি থাকার কল্যাণে। নাম হইয়াছে United Nations/Japan Long-term Fellowship Programme “Post-graduate study on Nano-Satellite Technologies (PNST)” (http://cent.ele.kyutech.ac.jp/unitednations.html)। দুইজন কে Ph.D. আর চার জনকে M.S. বৃত্তি দেবে এবং এদের বাছাই ও চূড়ান্ত করবে Kyutech এর মাস্টাররা, যাদের মধ্যে আমিও ছিলুম। সারা পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশ থেকে নেয়া হবে, যাদের কৃত্রিম উপগ্রহ নাই কিন্তু ইচ্ছা আছে, স্বপ্ন আছে। দুর্দান্ত প্রতিযোগিতা হইল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন শিক্ষক মনোনীত হইলেন জাপান সরকারের বৃত্তির জন্য। কিন্তু বিধি বাম, জাপানের বিমানে উঠিবার সপ্তাহ খানেক পুরবেই পারিবারিক কারণে আসিতে নারাজি হইলেন। পরে বুঝিতে পারিলুম উনি আমেরিকা যাইবেন এবং গিয়াছিলেন। একটি বৃত্তি নষ্ট হইল, সরকারের কাছে আমাদের ক্ষমা চাইতে হইল। আমি আর খালিল মাথার চুল ছিঁড়িতে লাগিলুম এই ভেবে যে নিকট ভবিষ্যতে এই সুযোগ আর হইবে কি ?

চলবে …………

[As seen at: https://www.facebook.com/arifur.khan.7/posts/10155521919627280

Published on: 26th May, 2017

Retrieved: 5th June, 2018]

পর্ব-৩

৪-সপ্তাহের বিশেষকার্য সারিয়া, জন্মদাতা পিতামাতা, বন্ধুদের ভালবাসা আর জন্মভূমির বাতাস ফুসফুসে ভরিয়া জাপানে কর্মস্থলে ফিরিলুম। কিন্রু মস্তস্কে ঘুরিতেছে কিভাবে অগ্রসর হইব। আমাদের গবেষণাগারে (LaSEINE, Kyutech) সারা বিশ্ব থেকে ছয় জন ছাত্র আসার কথা, পাইলুম পাঁচজন, বাংলাদেশ ছাড়া। একটি বৃত্তি নষ্ট হইয়াছে, মুখে কিছুটা কালিমা লাগিয়াছে, ইহাকে মুছিতে হইবে। কিছুটা আশার সঞ্চয় হইল এই ভাবিয়া যে দুইজন ছাত্রকে পাওয়ার সম্ভবনা আছে, Maisun Ibn Monowarএবং Ahk Kafi, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের, বৈদ্যুতিক ও তড়িৎ কৌশলের শেষ বর্ষের ছাত্র, পিতামাতার পয়সায় আমাদের গবেষণাগারে গবেষণামূলক প্রবন্ধতে (Thesis) কাজ করতে আগ্রহী। আগ্রহও দেখিলুম, মনেও ধরিল । এইবার পরিকল্পনাটা একটু ভিন্ন পথে ঘুরাইতে হইবে বলিয়া মনে হইল।

UNISEC GLOBAL (http://www.unisec-global.org/) নামে একটা সংগঠন আছে যাদের কাজ হচ্ছে সারা পৃথিবী থেকে উদীয়মান মহাকাশ গবেষকদের, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, একত্রিত করে তালিম দেওয়া যে কৃত্রিম উপগ্রহ কি, এতে কি কি আছে, কিভাবে কাজ করে, কিভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হয় ভূমি থেকে, ঝুঁকি নির্মূলে কি কি করিতে হয়, ইত্যাদি, ইত্যাদি। খলিলের সহিত মাকড়সার জালে বসিয়া বুদ্ধিতে শান দেওয়া শুরু হল, কিভাবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়কে এর মধ্যে অন্তর্ভুক্তি করে আগামী প্রজন্মকে টেনে-হিঁচড়ে বাহির করিয়া, বিশ্বের কাছে পরিচিত করাইয়া, প্রমাণ দেওয়া; যাহাতে উন্নত বিশ্ব বুঝিতে পারঙ্গম হয় যে, উহু, বাংলাদেশ শুধু পানির উপর ভাসিতেই পারে না, মহাকাশেও উড়িতে পারে। UNISEC GLOBAL পরিচালিত এই হাতেকলমে শিক্ষার নাম দেওয়া হইয়াছে CanSat Leader Training Program (CLTP) । তথ্য সংগ্রহ করিয়া পাইলুম যে, বাংলাদেশের একজন সন্মানিত বাক্তি এই প্রশংসাপত্র পাইয়াছেন, চুয়েট এর শিক্ষক, কিন্তু অংশগ্রহণ করেছেন জাপানের হক্কাইদো বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে, বাংলাদেশ থেকে নয়। আরও বুঝিলুম যে একজন বুয়েটের প্রফেসর বর্তমানে যিনি UNISEC GLOBAL এর বাংলাদেশের প্রতিনিধি হইয়া বসিয়া আছেন । যোগাযোগ শুরু হইল, তথ্য সংগ্রহ হইল । হতাশ হইলুম এই ভেবে যে, তাঁহারা শুধু মাকড়শার জালেই আছেন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়কে অথবা দেশকে ইহাতে অন্তর্ভুক্তিতে আগ্রহও দেখাননি । আল্লাহ মালুম, কেন? হয়ত ভবিষ্যতে করিতেন। যোগাযোগ করিলুম Rei Kawashima এর সহিত, যিনি উক্ত সংগঠনের সচিব, রাস্তা দেখাইলেন, সাহস দিলেন, কিঞ্চিত পূর্বঅভিজ্ঞাতায় হতাশার উল্লেখ করিলেন, তবে খুশি হইলেন এই ভাবিয়া যে জাপান থেকে এক চুনোপুঁটি চেষ্টা করিতেছিল। খালিল কে বুজাইলুম, এই এই করিতে হইবে, বাংলাদেশে থাকিয়া করা ভীষণ শক্ত, কিন্তু রাজি হইল। মনোবল দেখিয়া মুগ্ধ ও শিহরত হইলুম। এই না হইল দেশের সন্তান !

পরের বাধা হইল কিভাবে আমার বস, মেঙ্গু চো, কে বোঝানো যে, যা হইবার হইয়াছে, চল, সন্মুখে তাকাই। ভবিষ্যৎদ্রষ্টা, বুঝিল। ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে, BRACU এবং Kyutech এর মধ্যে মৌখিক চুক্তির উপর ভিত্তি করে এক জোড়া ঘুঘু জাপানে উড়িয়া আসিল, একজন ন্যাড়া, আরেকজন বোঁচা, দৈর্ঘ্যে। বুজাইলুম, তোমাদের হাতেই বাংলাদেশের ফুটুরি। কি বুঝিল কে জানে, নাকে-মুখে গুজিয়া কাজ করিয়া গেল। দেখিলুম, বস খুশি হইতেছে। মুল-কাণ্ড হইতে কুঁড়িতে পানি প্রবাহ বারিতে লাগিল, হইতো ভবিষ্যতে ফুটিবে। ইতোমধ্যে খলিল UNISEC GLOBAL এর সদস্য হইবার সকল প্রস্তুতি শেষ করিয়া ফেলিল। বুয়েট এর শিক্ষককে বুঝাইল, সরাসরি স্কাইপি দরবার হইল জাপান থেকে । ২০১৪ সালের নভেম্বরের ১৮-২০ তারিখে দ্বিতীয়বারের মত UNISEC GLOBAL এর মিটিং হইল কিয়শু প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এটাই অত্যুত্তম সুযোগ, ভিন্ন দুর-দেশে হইলে দুই ছাত্রকে পাঠাইতে পয়সা কোথায় পাইতাম । খলিল আর আমি ঠিক করিলুম কি কি বলিতে হইবে, কিভাবে উপস্থাপন করিলে বাঘ-সিংহের মর্মে পৌঁছাইবে, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় হইতে উনি স্কাইপিতে বক্তব্য রাখিলেন। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র কৃত্রিম উপগ্রহ লইয়া কি কি পরিকল্পনা আছে, কত দিবস-রজনী পরে আমাদের সক্ষমতা বাড়িবে, ইত্যাদি, ইত্যাদি, দেখাইলেন। শেষ কর্ম-দিবস শেষে, রজনীতে মাইসুন আর কাফির হাতে একখানা গাঢ়-সবুজ রঙের মলাট-আবদ্ধ কাগজ ধরাইয়া দিলো, ফিছিক-ফিছিক করিয়া অনেক ছবিও উঠিল। বুঝিলুম বাংলাদেশের ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এখন UNISEC GLOBAL এর সভ্য। পিছনে বসিয়া থাকা চুনোপুঁটির চক্ষু ঘোলা হইয়া আসিল। নাটক মঞ্চস্থ শেষ হইলে দুই গর্বিত বাংলাদেশী সরাসরি পিছনে বসা আমার নিকটে আসিয়া মলাট-আবদ্ধ কাগজটি ধরাইয়া দিয়া বলিল, স্যার, এটা আপনার জন্য। চশমাতে চক্ষু ঢাকিয়া ভাবিলুম ছাত্রদের কাছ থেকে একজন মাষ্টারের ইহার থাকিয়া আর বেশি কি বেশি পাওনা আছে।

চলবে …………

[As seen on: https://www.facebook.com/arifur.khan.7/posts/10155527358202280

Publisehd on: 28th May, 2017

Retrieved on: 5th June, 2018]

 

পর্ব-৪

ছয় পায়ে পিলপিল করে চলা পিপীলিকা মনঃস্থির করিল উড়িবে। কিন্তু কিভাবে ? UNISEC GLOBAL কিছুটা সাহস দিলো, দুই ছাত্রের মধ্যে স্ফুলিঙ্গ দেখিলুম। এদিকে প্রফেসর মেঙ্গু চো ও তাহাঁদের (Maisun Ibn Monowar এবং Ahk Kafi) সহজাত প্রবৃত্তি দেখিয়া মোহিত হইলেন। সময় আসিল UN-Japan বৃত্তির আবেদনের জন্য। আবারও সারা পৃথিবীর উদীয়মান দেশগুলো হইতে ছয়জনকে বাছাই করা হইবে। আমার বস প্রফেসর মেঙ্গু চো আমাকে কানে কানে বলিলেন মাইসুনকে আবেদন করতে এবং কাফিকে যেন যে কোন মূল্যে বাংলাদেশ থেকে অর্থায়ন করা হয়। এইবার আমি পরলুম ভীষণ বিপদে। এই বিপদের মধ্যেই মাইসুনের UN-Japan বৃত্তির জন্য সাক্ষাত্কার হইল এবং মার্চ মাসের গোড়াতে থিসিস জমা দিয়া দুই ঘুঘু দেশে উড়িল, ইহা ২০১৫ ঘটনা।

ইতোমধ্যেই BRACU এবং Kyutech মধ্যে কথা চালাচালি হইতেছে যাহাতে কাগজে কলমে চুক্তি সম্পাদন করা যাহাতে ভবিষ্যতের ছাত্রছাত্রীরা এবং গুণী মাষ্টারমশাইরা আবাধে দুইপক্ষ থেকেই চলাচল করিতে পারেন। ততদিনে আইনুন নিশাত স্যার আর ভিসি নহেন। পরিলুম নতুন বিপদে, খলিলের বিপদ আরও বেশি। আবার শূন্য থেকে শুরু করিতে হইবে। বেচারির দাড়িতে পাঁক ধরিল, রাত্রিকালীন নিদ্রা বায়ুতে ভাসিতে লাগিল, এমনকি অর্ধাঙ্গিনী বিছানা লইল। সেই গল্প হয়ত তাঁহার কলমিতেই শুনিব।

ততদিনে বাংলাদেশে উর্বর জমিনে আরেকটি স্ফুলিঙ্গের বিকাশ হইতেছিল বলিয়া ধারনা পাইলুম । তিনি Antara Anto। পিতামাতাকে মোহিত করিয়া গাঁটের কড়ি জোগাড় করিল, জাপানের হক্কাইদো বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবে, CanSat Leader Traning Program (CLTP) তে অংশগ্রহণ করিতে, ২০১৫ সালে । সাহসের বলিহারি। তাঁরচেয়েও বিশাল বলিদান করিয়াছেন উনার পিতামাতা। নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়া, কন্নাকে বিবাহের জন্য প্রস্তুত না করিয়া, বৈদেশে পাঠাইতেছেন কিনা ক্ষুদ্র কৃত্রিম উপগ্রহ বুঝিতে ! তাও আবার নিজেদের পকেট কাটিয়া! মাথা নত হইল। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান বলে সেই প্রথম মহিলা বাংলাদেশী যে কিনা ক্ষুদ্র কৃত্রিম উপগ্রহের জ্ঞান নিতে দেশ ছাড়িতেছে। বেগম রোকেয়া বাঁচিয়া থাকিলে তাঁহাকে বুকে জরাইয়া লইত।

LaSEINE, Kyutech (http://laseine.ele.kyutech.ac.jp/english) ততদিনে ইহার শৌর্য-বীর্য ছোট কৃত্রিম উপগ্রহ পরিবারে জানাইতে পারঙ্গম হইয়াছে। Kyutech এর তৈরি প্রথম ছোট কৃত্রিম উপগ্রহ, হরিও-২, মহাকেশে ৩৫০ ভোল্ট বিদ্যুৎ তৈরি করিয়া হাসিতেছে, যা বিশ্ব রেকর্ড। এই চুনোপুঁটির তৈরি সেন্সর ও তড়িৎ বর্তনীও তাহাতে কাজ করিতেছে। এই সফলতা পরের ছোট কৃত্রিম উপগ্রহতে আগ্রহও তৈরি করল, তৈরি হচ্ছে হরিও-৪ । আবারও চুনোপুঁটির ডাক, তৈরি কর সস্তা প্লাস্মা মাপার সেন্সর এবং তড়িৎ বর্তনী। এই ডামাডোলের মধ্যে বসের মাথায় নতুন পরিকল্পনা ঘুরছে। উদীয়মান এশিয়ার দেশগুলোকে ক্ষুদ্র কৃত্রিম উপগ্রহ হাতেকলমে বানানো শেখানো যা পরানো এবং মেধা তৈরি থেকে যুতসই, UNOOSA (http://www.unoosa.org) ও তাই চায়। আমি হইত এরই অপেক্ষাতেই ছিলুম। বস কে বললুম, দায়িত্ব দাও। দিলো বটে কিন্ত সর্তও দিলো, সময়ের সর্ত। এই সময়ের ভিতরে পারলে বাংলাদেশ ইন, নইলে আউট। সবকিছু দুরে ঠেলিয়া বাংলাদেশে উরিলুম, তখন ২০১৫ র জুলাই।

চলবে …………

[As seen at: https://www.facebook.com/arifur.khan.7/posts/10155531079232280

Published on: 29th May, 2017

Retrieved on: 5th June, 2017]

পর্ব-৫

মাটিতে চারা ফেলিলেই তরতর করিয়া বাড়িয়া উঠিবে বাঙলার ভূমি আর ততটাই উর্বর আছে কি ? বিজ্ঞানের কল্যাণে নানাবিধ সারের আমদানি হইয়াছে, নিয়মিত স্থান কাল পরিবেশ বুঝিয়া পরিমাণ মনঃস্থির করিতে হয়। তাহার চাইতেও বড় কথা ভূমি নিড়ানি দিয়া প্রস্তত করিতে হয়। এবার নিড়ানি খোঁজো, ভূমি খোঁজো, সারও খোঁজো।

শুরু হইল খোজা-খুঁজি। কিউশু শহরে গিয়া পরিচয় হইয়াছিল ক্ষণিকের জন্য বেড়াইতে আসা এনামুল ভাইয়ের (Anamul Huq) সাথে (ETV তে চাকুরী করতেন), আশির ভাইয়ের ( Ashir Ahmed ) মাধ্যমে। FB তে বলিলুম দেশের জন্য একটু কাজ করতে চাই, আপনার অনুগ্রহ প্রয়োজন, বুঝিলেন এবং রাজিও হইলেন। বাংলাদেশের স্বনামধন্য প্রফেসর জাফর ইকবাল স্যারকে তড়িৎ-ডাক পাঠাইলুম, সিলেটে বেড়াইতে আসিতে বলিলেন। Independent University, Bangladesh (IUB) এর EEE বিভাগের প্রধানকে অনুরধ করিলুম, শুধু আসিতেই বলিলেন না, মঞ্চও তৈরি করিয়া দিবেন, ভিসি স্যারের সাথে দেখা করাইয়া দিবেন, আশার বানী শুনিলুম। পূর্বের IUB নাই বলিয়া বোধ হইল । ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মৌসুমি জহুর (Moushumi Zahur) তাঁর বিভাগের প্রধান জিয়াউদ্দিন স্যারের সাথে আবারও যোগাযোগ করাইয়া দিলেন, যিনি ছিলেন বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা এবং দুর আনুধাবন প্রতিষ্ঠানের (SPARRSO) প্রধান। কথা হইল উনার সাথে। বলিলেন আমি বর্তমান প্রধানের সাথে পরিচয় করাইয়া দিব, তুমি দেশে আসো। আরেকজন স্বপ্নবাজ কূটনীতিকের অভাব মর্মে মর্মে অনুভব করিলুম, ডঃ জীবন রঞ্জন মজুমদার, জাপানে বাংলাদেশ এমব্যাসির ইকনমিক মিনিস্টার ছিলেন । ২০১৪ তে উনি টোকিও থেকে উড়ে এসেছিলেন LaSEINE, Kyutech দেখিতে এবং বসকে বুঝাইতে যে বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মাহাকেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ডঃ খলিল তখন পাশেই ছিলেন । এই মহৎপ্রাণ যে কোথায় আছেন ঠাওর করিতে পারিলুম না। সব কিছুর উপড়ে ডঃ খলিলের (Khalilur Rhaman) আশ্বাসবাণী তো আছেই। উনি বলিলেন আমাদের সবার মাথা স্যার ফজলে হাসান আবেদ তো আছেন, আরিফ ভাই, আপনি পীড়ন অনুভব করিতেছেন কেন ? শ্বাসাঘাত কি আর সুখে করিতেছি ভাই, আলোক-তন্তু-যোগাযোগ-প্রযুক্তি (Optical Fiber Communication Technology) লইয়া কি হইল, স্মরণ নাই? যাহাই হোক, আশাস্থল এই যে কিছু নিড়ানি সহ ভূমির আশ্বাস পাওয়া গেল । ইতোমধ্যে প্রাথমিক ভাবে প্রকল্পের নাম দেওয়া হইয়াছে Joint Global Multi National Birds project ( J:Japan, G:Ghana, M:Mongolia, N:Nigeria, B:Bangladesh)। সংক্ষেপে একে ডাকা হইল BIRDS Project । টুকিয়া রাখুন; এখনও বাংলাদেশ হইতে বিন্দু মাত্র আশ্বাস বানী নাই। স্বপ্ন পুরনে নিজ পকেট ফুটো করিয়া উড়োজাহাজের টিকেট কাটিয়া উরিলুম জন্মভূমিতে, ২০১৫ র জুলাই মাসে, হরিও-৪ এর Critical Design Review (CDR) শেষ করিয়া, মাহে রমজানের শেষে ঈদের পরের দিন।

বন্ধু বান্ধবের বাসায় সেমাই ফিন্নি ফুচকা খাইতেছি বটে, মাথায় ঘুরিতেছে দেশকে বুঝাইতে পারিব তো? এরই মধ্যে গোঁদের উপর বিষ ফোড়া। ভার্যা-ছা সহ পেটের ব্যামোতে পরিলুম। বংশধরের স্বাস্থ্য সঙ্গিন, ICU তে কাটাইতে হইল ৫-৬ দিবস। এনামুল (Anamul Huq) ভাই, রনি (Masudol Hassan Rony) ভাইকে নিয়া আসিলেন সান্ত্বনা দিতে। সঙ্গে Ahmed Bablu, Suhasini Ananda, Saidur Rahman তো সর্বক্ষণই আছেই। বাটীতে ফিরিতেই ঈদের ছুটি কাটাইয়া অফিস-আদালত প্রস্তুত হইল। SPARRSO তে গেলুম, বাঘা-বাঘা মহাকাশ বৈজ্ঞানিকদের বুঝাইলুম; কি চাই, কেন চাই, SPARRSO কি পাইবে, সরকার কি পাইবে, দেশ কি পাইবে, আগামী প্রজন্ম কি পাইবে, একটি ক্ষুদ্র কৃত্রিম উপগ্রহতে কত সময় দিতে হইবে, কত পয়সা লাগিবে, আমাদের, LaSEINE-Kyutech এর কতটুকু সামর্থ্য আছে । ডঃ খলিলের সহিত উনার তিন স্ফুলিঙ্গও উপস্থিত। যাহাদের একজনকে (মাইসুন) জাপান সরকার বৃত্তি দিতে রাজি হইয়াছে । এখন সঙ্গিন এবং সঙ্কটে আছে দেশ এবং দুইজন (Ahk Kafi এবং Antara Anto)। দেশের পক্ষ থেকে এই অধমেরা চাই প্রথম ক্ষুদ্র কৃত্রিম উপগ্রহ SPARRSO র হোক এবং একজোড়া অধ্যয়নকারীকে বৃত্তি দেওয়া হোক। ঊনারা বুঝিলেন বটে কিন্তু সিদ্ধান্ত দিতে পারিলেন না, চেয়ারম্যান অন্য বিষয়ে অনবসর থাকায়। তবে আগ্রহ দেখিয়া মোহিত হইলুম। বলিলেন ভিন্ন দিন আসুন, চেয়ারম্যান এর সাথে মিটিং করাইয়া দিব। আশার বানী শুনিলুম।

এনামুল ভাই ETV তে একদিন দুপুরে আমাকে LIVE প্রচার করিলেন। ( https://www.youtube.com/watch?v=q2gExGi61nQ) । দেশকে বোঝানোর চেষ্টা করিলুম। শেষ করিয়া এনামুল ভাইয়ের সাথে চা-আড্ডায় মগ্ন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থাকিয়া ফোন আসিল, স্যার ফজলে হাসান আবেদ দেখা করিতে চান। এর জন্য অবশ্য ভূমি আনুজ খলিলই তৈরি করিয়াছিল। ব্র্যাকের গাড়ী আসিয়া ছো মারিয়া তুলিয়া লইয়া গেল। ঢাকা শহরে চালকের পাণ্ডিত্য দেখিয়া মুগ্ধ এবং শিহরিত হইলুম। তিন ছাত্র, ডঃ খলিল, কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান এবং পাখা গজানো এই পিপীলিকা স্যারের কার্যালয়ে হানা দিলো । স্যার বলিলেন ১৫ মিনিট সময়, আমাকে বোঝান। ঢোক গিলিলুম। ৫ থেকে ৭ মিনিটও হয় নাই, বলিলেন কত পয়সা লাগিবে? বলিলুম। রাজি হইলেন। তারপরেই জানতে চাইলেন এই তিন ছানার কি হইবে? একজনের যে জাপান সরকার দুই বছরের বৃত্তি হইয়াছে- জানাইলুম। এখন মাথার যন্ত্রণা এই দুই ছানাপোনা। বলিলেন পলকের (ICT Minister) সাথে যোগাযোগ করে আমার কথা বলে বৃত্তি দিতে বল। বলিলুম আপ্রাণ চেষ্টা করিব কিন্তু দরজায় ঠোকা দিতে পারিব কিনা জানিনা। আরও জানিতে চাইলেন ডিগ্রি অর্জনের পরে কি হইবে? আমি বলিলুম, কি আর হইবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে মাষ্টারই করিবে, দেশে বসেই পরবর্তী কৃত্রিম উপগ্রহ বানাইবে। নয়ত, বাংলাদেশ সরকারের বড় কৃত্রিম উপগ্রহ বানাইবে। আমরা কতদিন আর বিদেশীদের দিকে তাকাইয়া থাকিব ? মীটিং শেষ করিয়াই ফিচিত করিয়া একটি ছবি তুলিয়াই উনি স্বীয় কর্মে মনোনিবেশ করিলেন। আমি দেহ আঁকাবাঁকা করিয়া আনন্দ প্রকাশ করিলুম ছানাপোনা দের সামনেই। এই আনন্দ, সুবাশ আর কই রাখি !!! ব্যাস, হইয়া গেল, বাংলাদেশের প্রথম ক্ষুদ্র কৃত্রিম উপগ্রহ হইয়া গেল। ইতিহাসে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম প্লাটিনাম দ্বারা খোদাই করিয়া রাখিল। এইবার শুরু হইল ছানাপোনাদের বৃত্তি খোজার পালা। তখনো এই পিপীলিকা বুঝিতে অক্ষম ছিল কোথায় কার ঘরের দিকে পিলপিল করিয়া যাইতেছিল।

চলবে …………………

[as seen at: https://www.facebook.com/arifur.khan.7/posts/10155534546162280

Published on: 30th May, 2017

Retrieved on: 5th June, 2018]

পর্ব-৬

বন্যা, কালবৈশাখী, রাজনৈতিক ডামাডোলে রঙ্গিন বদ্বীপের দেশে একটি চারা লাগাইয়া কি নিশ্চিন্তে ফেসবুকে লাইক আর শেয়ার দিলে চলিবে ? যদি ফল ধরিবার আগেই কাঁঠাল গাছের গোঁড়া বন্যার জলে নাকানি চোবানি খাইতে থাকে তাহা হইলে পরের বছর কাঁঠাল-বিচি ভর্তা দিয়া ভাত খাইবার আশা করা বোকামি নয় কি ? একটি চারা বুনিতে পারিয়াছি, আরও কিছু চারা পুতিতে হইবে ।

ছুটিলাম বুয়েটে। প্রফেসর জি, এম, তারেকুল ইসলাম (Tarekul Islam, Point of Contact, UNISEC GLOBAL) উনার দলকে প্রস্তুত রাখিলেন। আমার পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করিলুম। উনারা শুধুমাত্র কৃত্রিম উপগ্রহ হইতে প্রাপ্ত তথ্যের অভাব অনুভব করেন, বর্তমানে প্রাপ্ত তথ্য যথেষ্ট নহে। বুঝিলুম নিজস্ব কৃত্রিম উপগ্রহের ভালো বাজার আছে, নিজেদেরকে পরিপূর্ণ হইতে হইবে । একই অভাবের কথা শুনিয়াছিলাম স্পারসো ( SPARRSO) নিকট হইতে।

দৌড়াইলুম সিলেটে, পরিবার সহ। উদ্দেশ্য জাফর ইকবাল স্যারের (আমার স্বপ্ন পুরুষদের একজন) সহিত মোলাকাত পূর্বক বাংলাদেশে কৃত্রিম উপগ্রহের সম্ভবনা নিয়া গুরুগম্ভীর আলোচনা করা । কোথায় আলোচনা ! ভাই (Aminur Rahman), ভাইপো, ছা, ভ্রাতৃজায়া, শালী (দুঃখিত, শিলা), সকলেই ফটক (Picture) তুলিতে অস্থির হইয়া উঠিলেন । বুঝলুম লোকপ্রিয় হইবার যন্ত্রণা । এরই মাঝে সংক্ষিপ্ত করিয়া বুঝাইলুম কি করি আর কি করিতে চাই । আন্তরিক আভিনন্দন জানাইলেন। সেই সাথে SUST এর শহীদ মিনার ঘুরাইয়া দেখাইলেন। হয়ত ভবিষ্যতে একসাথে কিছু করা যাইবে, সেই আশাও শুনাইলেন ।

এবার আবার ঢাকাতে। গেলুম Independent University Bangladesh (IUB) তে । আমার পুরাতন কর্মস্থল। EEE বিভাগের সেমিনার মঞ্চে দেখাইলুম কি করি আর কি করিতে ইচ্ছুক । উনাদের আগ্রহ দেখিয়া বিমোহিত হইলুম। BIRDS এ অন্তর্ভুক্তি হইতে চাইলেন। সবার সাথে লাঞ্ছিত (Had lunch together) হইলুম । ভিসি স্যারের (প্রাক্তন সহকর্মী, SESM) সহিত কথা হইল, MOU (Memorendum of Understanding ) নিয়া, IUB এবং Kyutech মধ্যে। পরে হইয়াছিলও, একটি চারা বাড়িল । পরে বন্ধু ও অতীত সহকর্মীদের সাথে (আফরোজা সুলতানা বিন্দু (ASB), Hafizur Rahman, Abdul Khaleque, Tapos Sarkar, ) গালগল্প করিয়া বিদায় লইলুম।

আবার ডাক পড়িল স্পারসো হইতে। চেয়ারম্যান ম্যাডাম কথা বলিতে চান। খলিল আর আমি আবার ছুটিলুম। আবার বুঝাইলুম, খলিলই বেশি কথা বলিল। চেয়ারম্যান ম্যাডামের চোখে আলোক রশ্মি দেখিয়া আনন্দে শিহরিত হইলুম। কিন্তু স্পারসোর কিছুটা সময় দরকার। সময় নিন, আমরা সবসময় যোগাযোগ রাখিব। আমাদের ছানাপোনাকে লেখাপড়া শেষে চাকুরী দিতে চাইলেন । কিন্তু এখনই ব্যাঙ্গাচিদের বৃত্তির জন্য রাজি কারাইতে পারিলুম না।

আমি দেশে আসিবার পূর্বেই খলিল বিভিন্ন দরবারে টোকা দিয়া যাইতেছিল যাহাতে দুই পিচ্চিকে বৃত্তির সুখবর শুনাইতে পারে। বেচারার নাওয়া খাওয়া হারাম হইয়া গেল, কিন্তু পারিল না। এইবার আমি আসিয়া যুক্ত হইলুম। দেশী যোগী ভিখ পায়না বিদেশী যোগী। কালে কালে বুঝিলুম বিধাতা দুরে বসিয়া মজা দেখিতেছেন ।

যাহার নিকটে যাইনে কেন, সবাই একই কথা বলিয়া তাড়াইয়া দেয় । মাননীয় ICT Minister পলক সাহেবকে ধরুন। কিন্তু কিভাবে ? শুরু হইল মিশন ইম্পসিবল। রাকিব মামা (Rakib Ahmed) কে ধরিলুম, রিপন (Shahidul Islam Ripon) ভাগ্নেকে ধরিলুম, বন্ধু ইব্রাহিম (Ibrahim Khalil) কে ধরিলুম, শত্রু কালাকে ধরিলুম।

ইব্রাহিম লইয়া গেলো ডঃ হাবিবুল মিল্লাত (মুন্না ভাই) সাহেবের কাছে, মাননীয় মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের বাসায়, বেইলি রোডে। আমি একবার বুঝাইয়া বলার পর উনি আমার দিকে চোখ বড় করিয়া তাকাইলেন। আমি প্রমাদ গুনিলুম। বলিলেন সাবাই আসে নিজের কথা বলিতে আর তুমি, আমার সিরাজগঞ্জের ছেলে, আসিয়াছ কৃত্রিম উপগ্রহ নিয়া দেশের কথা বলতে ! বুকে জরাইয়া ধরিলেন। দুইটি ফোন নাম্বারে ফোন দিলেন (মাননীয় BTRC এবং ICT মিনিস্টার), কিন্তু ধরিল না। নম্বর দুইটি দিয়া বলিলেন, আমার কথা বলিয়া দুইজনকে ফোন দিয়া কথা বল, কাজ হইবে। বুকের ছাটি বাহান্ন করিয়া ফিরিয়া আসিলুম। পরে অনেকবার চেষ্টা করিয়াছিলুম, মুঠোফোনে, খুদে বার্তা পাঠিয়েও, কাজ হয়নি।

এইবার সর্বশেষ চেষ্টা। কাফির নানা, জাভেদ আলি সরকার। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের Executive Director, ঐ সময়ে । ICT, BRACU এবং Kyutech, এই তিন পক্ষকে লইয়া একটি গবেষণা চুক্তি করা যাই কিনা, চেষ্টা করতেছিলেন, যাহাতে সরকারের সাথে ভবিষ্যতে কৃত্রিম উপগ্রহ নিয়া সরাসরি কাজ করা সম্ভব হয় এবং দুই ছানাপোনাকে ( Ahk Kafi এবং Antara Anto) ছাত্র-বৃত্তির আওতায় আনা যায় । উনি আশা দিলেন যে পলক সাহেবকে বুঝাইবেন, এই আশায় যে, মিনিস্টার সাহেব এবং তাঁর প্রধান PS একই ICT ভবনে বসেন এবং প্রতি সপ্তাহেই উনাদের সাথে আইসিটি মিনিস্টারের মিটিং হয় । কিন্তু বাম বিধি আর ডান দিকে ঘুরিলেন না।

এইবার সর্বশেষের সর্বশেষ চেষ্টা। দুই ব্যাংগাচি কে বলিলুম, পয়সাতো জোগাড় করিতে পারিলুম না, দেশের জন্য বাবামায়ের ঘরে সিঁদ কাটিতে পারিবি কিনা, বল? হাসিয়া কহিল; স্যার, চিন্তা করিবেন না, মা-বাবা রাজি হইবেন।

তবে রে, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমি, দুই মাষ্টার কে এতো কষ্ট কেন করাইলি?

এইবার আমার কাজে ফিরিবার পালা। খলিলকে বলিলাম আগামীতে কি কি করিতে হইবে। ব্র্যাক Kyutech এর সাথে BIRDS নিয়া চুক্তি করিতে হইবে এবং ক্ষুদ্র কৃত্রিম উপগ্রহের জন্য পয়সা পাঠাইতে হইবে, মহাকাশ হইতে তথ্য নামাইতে ভু-উপগ্রহ কেন্দ্র (Ground Station) করিতে হইবে, ছাত্রশিক্ষক চুক্তি করিতে হইবে । আমি, ইহা করিতে হইবে, উহা করিতে হইবে বলিয়া সব দায়িত্ব খলিলের উপর দিয়া উড়িলুম। এবং সকলের সকল বিষ হজম করিয়া বাকী পুরো কাজটাই উনি সফলতার সাথে করিতে পারিয়াছেন বলিয়া আজ BRACUতে এবং বাংলাদেশে এতো আনন্দ । উনার লেখনীতেই আমারা আগামীতে তা বিস্তারিত জানিবার আশা পোষণ করি।

শির নত করিয়া আনুভূমিক প্রণাম করিতেছি সেই মা-বাবাকে, যারা দুই-দুইটি বছর ধরিয়া দুইটি ছানাপোনাকে দূরদেশে পুষিয়া যাইতেছেন। দেশের ইতিহাসে তা হয়ত লেখা থাকবে না, কিন্তু বাঙ্গালদেশে তিনজন যে ইতিহাস করিয়া ফেলিল তার গর্ব বহন করাও গর্ভ বহন করার সামিল।

আগামী খণ্ডে সমাপ্ত …………………

[As seen on: https://www.facebook.com/arifur.khan.7/posts/10155538752602280

Published on: 31 May, 2017

Retrieve on: 5th June, 2018]

 

পর্ব-৭ (শেষ পর্ব )

আধুনিক দুর্বল চিত্তের প্রেমিক প্রেমিকারদের মধ্যে সর্বদাই একটি মনোভাব ঘুরিতে থাকেঃ চোখের আড়াল হইলেই মনের আড়াল। মুঠোফোন, ক্ষুদেবার্তা, ইন্টারনেট ফেসবুক, ইত্যাদি দিয়ে ধরিয়া রাখিতে হয়। হারাইয়া গেলে, গেলো। আবার নতুন নাটকের পাত্র-পাত্রী খোঁজো। আমি কর্মক্ষেত্রে ফিরিয়া আসিলাম বটে, তবে লাটিমের মতই সর্বক্ষণ উপরোক্ত অনুভূতি মাথার ভিতরে চক্রাকারে ঘুরিত থাকিল। ইহা বিফল হইলে নতুন নাটকের পাত্র-পাত্রী পাইব কোথায়, বসকে কি বলিব? অনুজ খলিলের উপড়ে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়া চলিয়া আসিতে হইল, শেষ পর্যন্ত কাগজে-কলমে পারিবে তো? খলিলকে লইয়া দুশ্চিন্তা নহে, মাথার পীড়ন হচ্ছে জন্মভূমির পরিবেশ এবং পাত্র-পাত্রী।

পূর্বেই উল্লেখ করিয়া ছিলুম যে BIRDS প্রোজেক্ট একটি বহুদেশিও ক্ষুদ্র কৃত্রিম উপগ্রহের ঝাঁক (Small satellite constellation) যাহাতে অংশ গ্রহণ করিতেছে জাপান, ঘানা, মঙ্গোলিয়া, নাইজেরিয়া এবং বাংলাদেশ। এবং ইহাই প্রথম আন্তর্জাতিক কৃত্রিম উপগ্রহের ঝাঁকের উদ্যোগ। মাথা নত করিয়া সন্মান জানাই বসকে ( Mengu Cho) যিনি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়াছেন উদীয়মান দেশকে মহাকাশে লইয়া যাইবেন বলিয়া এবং তিনটি দেশের জন্য ( ঘানা, মঙ্গোলিয়া এবং বাংলাদেশ ) ইহাই হইবে নিজেদের তৈরি প্রথম ক্ষুদ্র কৃত্রিম উপগ্রহ। আকার এবং ভর হইবে যথাক্রমে ১০ সেমি. ঘনকাকার ও ১ কেজির মত। ইহার প্রধানতম কাজ হইতেছে দেশের জন্য মানব-শক্তি তৈরি করা যাহারা অতঃপর দেশে থাকিয়াই পরবর্তী কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরিতে মনযোগী হইতে পারিবেন । অন্নান্য পরিবেশনা হইবে মহাকাশ হইতে জাতীয় সংগীত সম্প্রচার, ভূমিচিত্র পাঠানো, বায়ুমন্ডলের ঘনত্বের বিন্যাস পরিমাপ করা, বিরক্তিকর একক ঘটনা বা ক্ষণ-একক-বিপর্যয় (Single Event Latch-up, SEL), যা মাইক্রোপ্রসেসরকে মুহূর্তের মধ্যে অকেজো কোরিয়া দেয়, তার স্বরূপ উন্মোচণ এবং এমন পদ্ধতির ব্যবহার প্রমান করা যাহাতে GPS ছাড়াই ঝাঁকের কইমাছের অবস্থান নির্ণয় করা যাইবে।

যে কোনো কৃত্রিম উপগ্রহের জন্য দুইটি উপাদান অতিশয় গুরুত্ব বহন করে, তাহা হইতেছে উপগ্রহের ঘূর্ণন কক্ষপথ (Satellite orbit) এবং যোগাযোগ তরঙ্গ (Communication frequency)| সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার প্রথম বিশাল কৃত্রিম উপগ্রহ, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, লইয়া কাজ করিতেছেন, যাহা প্রায় শেষের দিকে। এর কল্লানে দেশবাসী উপগ্রহের অবস্থান (Satellite orbit) এবং যোগাযোগ তরঙ্গ (Communication frequency) সম্পর্কে ধারণা পাইয়াছেন। BRACU এবং Kyutech এর মধ্যে চুক্তি সাক্ষর হইলে মুহূর্তের মধ্যে ইহা হস্তগত হইবে এবং যাহার উপর ভিত্তি করিয়া পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হইবে বলিয়া অতিশয় দ্রত চুক্তি হওয়া জরুরি। দেরিতে হইলেও হইয়াছিল। আশা করি খলিলের লেখনী হইতে কিভাবে হইল তাহা বিস্তারিত জানিতে পারিব।

এরই মধ্যে অন্তরা জাপানের হক্কাইদোতে আসিল Cansat Leader Tranning Program, CLTP তে ( http://www.cltp.info/voices.html)। উনি যে এই দলে একমাত্র মহিলা তাহাই নহে, সমগ্র বাংলাদেশ থেকে আসা প্রথম অংশগ্রহণকারী এবং প্রথম মহিলা। প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরিয়া, নাকে মুখে খাইয়া, কাফি এবং মাইসুনকে সহ জাপানে উড়ল আসল কাজ শুরু করিবে বলিয়া। পরে জনপ্রিয় পত্রিকা প্রথম আলো এর গুরুত্ব বুঝিল। খুদে স্যাটেলাইটে বড় স্বপ্ন-এই শিরোনামে তা প্রকাশ পাইল ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পাতায়। জাপানে আসিয়া দেখিল BIRDS প্রোজেক্ট দলে সেই একমাত্র মহিলা। ভাবুনতো, মহাকাশে মহাশক্তিধর দেশের বাঘা-বাঘা বিজ্ঞানীরা দেখিয়া কি ভাবিবেন?

BIRDS প্রোজেক্ট দলে সকলের কাজ ভাগাভাগি হইল, কে কি কাজ করিবে। মাইসুন পাইল Ground Station Communication (9600 bps), কাফি পাইল Digi-Singer, মহাশূন্য থেকে যাহা সঙ্গীত প্রচার করিবে এবং ক্ষণ-একক-বিপর্যয় (Single Event latch-up, SEL) পরিমাপন, আর অন্তরা পাইল এন্টেনা বিস্তৃতির (Antenna deployment) চ্যালেঞ্জ। রাতের পর রাত ল্যাবে কাটাইল, সময়ের অভাবে নুডুলভুগি হইল, সহকর্মীদের সাথে তথ্য ও কৌশল লইয়া মনমালিন্য হইল, কেহর অতি বাচালেতে মাথার পীড়ন বাড়িল, কিন্তু কাজ আগাইয়া গেলো। বস Mengu Cho সপ্তাহান্তে কাজের প্রকাশ দেখেন, মাসুই সান আর আমি আমাদের অভিজ্ঞতা দিয়া কাজ করাইয়া দেই, তাদের তৈরি প্রযুক্তি প্রমাণ করাইয়া দেই। অথবা ভবিষৎবাণী করিয়া দেই যে পরে কি কি অসুবিধা হইতে পারে। কাজে অকাজে নিজ কোয়ার্টারে দাওয়াত দিয়া খাওয়াই অথবা ক্লান্ত দেখাইলে দুরে ঘুরিতে লইয়া যাই। পাশের বা দুরের শহরে যাইয়া জোর করিয়া বাংলাদেশীদের সাথে পরিচয় করাইয়া দেই এই বলিয়া যে, এদেরকে চিনিয়া রাখিও; পরে কিন্তু অটোগ্রাফ লাগিবে অথবা BCS পরীক্ষাপত্রে এদের নাম লিখিতে হইবে।

ধীরে ধীরে বাংলাদেশ হইতে সুখবর আসিতে লাগিল। BTRCর GS চালনার অনুমোদন পাওয়া গিয়াছে, বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক টাকা ছাড় দিতে রাজি হইয়াছে, ব্র্যাক পয়সা পাঠাইতে প্রস্তুত। এদিকে তিন বাঙ্গাচি ভু-উপগ্রহ কেন্দ্র থেকে কৃত্রিম উপগ্রহ পর্যন্ত যোগাযোগের জন্য আন্তর্জাতিক সনদ (Ameture band GS operation licence) পাইয়াছেন Federal Communications Commision of USA থেকে। ধীরে ধীরে Prototype থেকে Engineering Model হইল, এবার টেস্টিং এর পালা, তাও হইল। ছানাপোনারা বড় হইতে শুরু করিয়াছে, আত্মবিশ্বাস বাড়িয়াছে। বুঝিলুম আমার প্রয়োজন ফুরাইল। উড়িলুম ভিনদেশে, NASAর অর্থায়নে চালিত একটি সেন্টার (cSETR, UTEP, Texas) ক্ষুদ্র কৃত্রিম উপগ্রহ নিয়া ভাবিতেছে, আমাকে দরকার।

অন্যদিকে তিন ফড়িং সহকর্মীদের লইয়া Flight model তৈরি করিল। এবার দেশকে জানানো দরকার। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খলিল আসিল, ভিসি স্যার নিজের ছাত্রদের বাহাদুরি দেখাইতে অর্ধাঙ্গিনীকে লইয়া আসিলেন, বাংলাদেশ এমব্যাসি, টোকিয়ো থেকে সরকারের প্রতিনিধি হইয়া Counsellor ডঃ জিয়াউল আবেদিন আসিলেন (ধন্যবাদ Zakir Hossain), নিকটবর্তী ফুকুওকা শহর থেকে রহমান ভাই ( Mokhlesur Rahman) আসিলেন, সবাইকে সন্মানিত করিতে Werner Balogh (Program Manager, UNOOSA) আসিলেন । আর আমার বস Mengu Cho তো মধ্যমণি হইয়া আছেনই । আর এই চুনোপুঁটি El Paso থেকে স্কাইপিতে বদন দেখাইবার সাহস দেখাইল। বাংলাদেশে, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকিলেন জিয়াউদ্দিন স্যার, BTRC প্রতিনিধি, জাপান এমব্যাসির প্রতিনিধি সহ আরও অনেকে। প্রচার কর্মীরা তাহাঁদের ক্যামেরা লইয়া হাজির হইলেন। শুরু হইল Press Conference, ফেব্রিয়ারি ৮, ২০১৭। সে এক মহাউৎসব শুরু । বাংলাদেশের প্রথম ক্ষুদ্র কৃত্রিম উপগ্রহ, নাম BRAC Onnesha, তার একটি অনুরূপ প্রফেসর মেঙ্গু চো ভিসি স্যারের হাতে উঠাইয়া দিলেন। আহা আজি আকাশে কতইনা আলোক রশ্মি, বাতাসে কতইনা সুগন্ধ, ভূমিতে কতইনা পুস্পরাজি। বদনে বদনে কতইনা রঙের খেলা। পরদিন কাফি Flight model লইয়া JAXA (Japan Aerospace Exploration Agency) তে ছুটিল। অতঃপর পাঁচ দেশের পাঁচটি মাণিক্য SpaceX (Satellite launch provider, USA) কে হস্তান্তর করা হইবে।

এরই মধ্যে ডঃ খলিল উনার বাঙ্গাচিদের (মোঃ মুজাম্মেল হক, Bijoy Talukder, Arafat Haque, Sanada Jogoti Chayan, Aunul Huda, Jamil Arefin এবং Arafat Haque) লইয়া GS তৈরি করিয়া ফেলিল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়র ছাদে । পরীক্ষামূলক ভাবে নোয়া (NOAA) আবহাওয়া উপগ্রহ থেকে বাংলাদেশের উপর দিয়া প্রবাহিত ঝরের (MORA) ছবি তুলিয়া দেশবাসীকে তাক লাগাইয়া দিল। স্যার ফজলে হাসান আবেদ আসিয়া উদ্বোধনি ভেঁপু বাজাইয়া গেলেন।

এইবার আসিল সেই মহেন্দ্রক্ষণ। বাংলাদেশ সময় ২ জুন ভোর ৩ টা ৫৫ মিনিটে (জাপান সময় ৬টা ৫৫ মিনিটে এবং টেক্সাস সময় ১ জুন বেলা ৩ টা ৫৫ মিনিটে) যুক্তরাজ্যের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্জের স্পেস কেনেডি সেন্টার হইতে SpaceX Falcon 9 রকেটের মাধ্যমে উড়ানো হবে SpX-11 নামে একটি কার্গো যান, যা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে প্রয়োজনীয় সামগ্রী লইয়া যাইবে। তাহাতে থাকিবে পাঁচটি দেশের পাঁচটি স্বপ্ন, থাকবে BRAC Onnesha, বাংলাদেশের প্রথম ক্ষুদ্র কৃত্রিম উপগ্রহ। অতঃপর সুবিধা জনক সময়ে ছুড়িয়া দেওয়া হইবে মহাশূন্যে, শুরু হইবে তার জীবনকাল, যাহা তৈরি করিয়াছেন বাংলাদেশের তিনজন ক্ষুদে স্বপ্নবাজ।

সমাপ্ত ।

[As seen at: https://www.facebook.com/arifur.khan.7/posts/10155542382682280

Published on: 1st June, 2017

Retrieved on: 5th June, 2018]

 

Author Profile

Born in Narayangonj, Bangladesh, in 1973. He received his B.Sc and M.Sc degrees from the department of Applied Chemistry and Chemical Engineering, University of Dhaka, Bangladesh in 1996 and 1998, respectively. From 1999 to 2004, he was lecturer at the Ahasanullah University of Science and Technology (AUST) and Independent University, Bangladesh (IUB). In 2004, he started his PhD as Monbukagakhusho: MEXT student and received doctoral degree in 2008 from the department of Electrical and Electronic Engineering of Kyushu Institute of Technology. He had been a postdoctoral researcher from 2008 to 2013 with the Laboratory of Spacecraft Environment Interaction Engineering (LaSEINE) of Kyushu Institute of Technology. Since December 2013, he has been promoted to Assistant Professor of LaSEINE. After forming the BIRDS project and running successfully, from April 1, 2016, he has been hired by University of Texas at El Paso (UTEP) as Assistant professor to develop a small satellite facilities, similar to Kyutech, funded by NASA. Although Dr. Khan (arkhan@utep.edu) is physically no more with the BIRDS project, he is always with us as a starting member. His research interests are ESD on solar cells, material degradation in space environments, plasma interactions, charge transportation, EMC, ground testing of small satellite, and development of novel space grade materials.

 

——————————————————————————————————-

Compiled by Maisun Ibn Monowar.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.